বিদ্যাসাগর
শঙ্খ ঘোষ
পথে একটা ছাতা চলছে। না, মানুষ আছে ওর মধ্যে। ছোট্ট একটা মানুষ। পড়ুয়া সঙ্গীসাথীরা বলছে, ঐ আসছে কশুরে জৈ। তাই শুনে ছোটো মানুষটি বারে বারেই খেপে যায়। আর ততই কশুরে জৈ কশুরে জৈ রব ওঠে তাকে ঘিরে। গা জ্বলে যায় রাগে। কিন্তু মুশকিল, রাগলে আবার কথা বলা যায় না। তোতলা যে একটু।
কশুরে জৈ মানে যশুরে কৈ। যশোরের কৈ মাছের মাথাটা নাকি বড়ো। ছোট্ট ঈশ্বরের দেহখানি ছোটো বটে, কিন্তু মাথাটা ছিল প্রকাণ্ড। যশুরে কৈ-তাকে উলটে নিয়ে হলো কশুরে জৈ। আর তাই শুনে তেলে-বেগুনে জ্বলতে থাকে ঈশ্বর।
কিন্তু ঐ যে কশুরে জৈ এক ছাতা মাথায় দিয়ে, টুকটুক করে আসে, পড়াশোনায় সে এখানেও ডিঙিয়ে গেল সকলকে। সব পণ্ডিতমশাইরই তাকে পছন্দ। ঐ অল্পবয়সে তার বুঝবার আর মনে রাখবার ক্ষমতা দেখে তো সকলে অবাক। তাঁরা বলতেন, ঈশ্বর শ্রুতিধর। বলতেন, এ ছেলে কলেজের অলংকার। ব্যাকরণ সাহিত্য দর্শন সর্বত্র তার সমান উদ্দীপনা, সমান অধ্যবসায়। অথচ, ওই তো রোগা পাটকাঠির মতো চেহারা, ওই তো বয়েস। কেউ বিশ্বাস করতেই না যে এই ছেলে এমন পণ্ডিত।
কিন্তু কলকাতাতেও তার শরীর ভালো হবার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। বরং প্রায়ই রোগে ভুগতে ভুগতে, ক্ষীণ হতে লাগল ছেলে। তার ওপর আছে ঘরের সব খাটুনি।
ঠাকুরদাসের মনিবের বাড়িতে এখন ঈশ্বরের আস্তানা। বাবার আয় নেই বললেই চলে, তদুপরি কলকাতায় বাস। ফলে কষ্টের শেষ নেই। কখনো ভাত জুটছে, কখনো জুটছে না-কখনো ভাতের সঙ্গে আর কিছু নয়, শুধুই শুকনো ভাত। কখনো শুধু তরকারি, ভাত আর নয়। পরনে বাড়ির চরকা-কাটা মোটা কাপড়। কিন্তু এ কি তাকে দমাতে পেরেছিল একটুও? ঐ বয়সেও? বরং বৃত্তির যা কিছু টাকা পেত সে, বেশির ভাগ সময়েই তা খরচ করে বসত সহপাঠী বন্ধুদের জন্য। বলত, বড়ো গরিব ওরা। একটু একটু সাহায্য না করলে তো পড়া হবে না ওদের।
এমনি সময়ে মেজোভাই দীনবন্ধুকেও আনা হলো কলকাতায়। আগেই খাটুনির অন্ত ছিল না, এখন তা বাড়ল আরো। জনচারেকের রান্না রাঁধতে হচ্ছে নিজেকেই। বাজার করো, রাঁধোবাড়ো, বাসন মাজো। বাটনা বেটে, কাঠ চিরে, বাসন মেজে হাতের তার দশা হলো শোচনীয়, আঙুল আর নখ ক্ষয়ে ক্ষয়ে একশা।
এত সব করে পড়া হয় কখন? কলেজে যাবার সময়ে বা ফিরবার সময়ে, পথে পথে। নয়তো রাত্রে-গভীর রাত্রে। কোনোদিন মাঝরাত পর্যন্ত জেগে, কোনোদিন সারারাত। অত রাত্রিতে ঘুমে ভেঙে আসে চোখ। ঐ চেহারা, ঐ পরিশ্রম, শরীর সইবে কেন। কিন্তু ঘুম পেলে তো চলবে না। একে তো ঘুমুলে আর পড়া হয় না, নিজের মনই উশখুশ করে। তার উপর আছে বাবার ভয়। কী ডাকসাইটে বাবা। ফিরে যদি দেখলেন ছেলে ঘুমাচ্ছে তো আর কথা নেই। শুরু হলো বিষম মার। বাড়ির ভিতরের মেয়েরা ছুটে এসে ঠেকাতেন, এ কী কাণ্ড বাপু এমন করবে তো অন্য বাড়ি দেখো।
তাই জাগতে হতোই ঈশ্বরকে। প্রদীপের তেল চোখে মেখে যন্ত্রণায় ছটফট করত সে। ঘুম তো অন্তত এড়ানো গেল, যন্ত্রণা গায়ে লাগে না।
রান্নার ঘরই বলো, শোবার ঘরই বলো, ঘরের অবস্থা ছিল চমৎকার। একতলার অন্ধকার ঘুপসি ঘর, জানলা নেই কোনোদিকে। তারই মধ্যে রান্না। নর্দমার বিশ্রী গন্ধ আর কিলবিল করে পোকা ঢুকছে ঘরে।। তাই তাড়াবার জন্য এক ঘটি জল নিয়ে বসে আছে রাঁধুনি ঈশ্বর। একদিন তো তরকারির মধ্যেই উড়ে পড়ল এক আরশোলা। খাবার সময়ে সেটা চোখে পড়ল তার। কিন্তু বাবা বা ভাই জানতে পেরে যদি খাওয়া ছেড়ে উঠে যান, এই ভয়ে চিবিয়েই খেয়ে ফেলল আস্ত সেই আরশোলা।
শোবার ব্যবস্থা দেড় হাত চওড়া আর ছ হাত লম্বা একফালি বারান্দায়। বারান্দার কার্নিশই বালিশ। সেই বারান্দার ওপর একটা মাদুর বিছিয়ে কুঁকড়েমুকড়ে ঘুমিয়ে থাকত ঈশ্বর। কোনো কোনো দিন ভাই এসে ঘুমিয়ে রইল সেইখানে, সেদিন আর সারারাত ঘুম নেই তার চোখে। রাস্তার গ্যাসবাতির নিচে বসে পড়া তৈরি করছে সে আপন মনে।
এরই মধ্যে একদিন একটা কাণ্ড হলো। বামুনের ছেলেকে সন্ধ্যা করতে হয়, মন্ত্রপাঠ, আরো কী কী। অথচ ঈশ্বরের ধরনধারণ দেখে তার কাকার ভারি সন্দেহ। ‘সন্ধ্যামন্ত্রটা একবার জোরে আওড়াও তো বাপু’। ধরা পড়ে গেল ছেলে। সত্যি ভুলে গেছে। এলেন বাবা। শুনলেন সব। বামুনের ছেলে হয়ে সন্ধ্যা ভুলেছ? এত বড়ো কথা! শুরু হলো মার।
যে ছেলে শ্রুতিধর, এমন পণ্ডিত যে ছেলে, সামান্য ঐ সন্ধ্যামন্ত্র সে ভুলল কেমন করে? আসলে, জিনিসটাকে নিশ্চয় খুব আমল দেয়নি ঈশ্বর। কী হবে ঐ তুকতাক মন্ত্র আউড়ে? দেবতা? দেবতা তো মা আর বাবা। আর কিছুতে বিশ্বাস নেই তার। বিশ্বাস যেখানে নেই, একাগ্রতাও নেই, একাগ্রতা না থাকলে মনে থাকবে কী করে ঐ হিজিবিজি কথা?
ছাত্রজীবনে এ-সময়ে আরেকটা ঘটনা ঘটল। ঈশ্বরের অধ্যাপকদের একজন ছিলেন শম্ভুনাথ তর্কবাচস্পতি। বাচস্পতি তখন রীতিমতো বুড়ো, প্রায় জরদগব। নিজের কোনো কাজ করতে পারেন না নিজে। এমন সময়ে হঠাৎ খেয়াল হলো তাঁর, আবার একটা বিয়ে করলে কেমন হয়?
কথাটা শুনে এখন খুব আশ্চর্য লাগে। তখন কিন্তু তত আশ্চর্যের ছিল না। পুরুষ হলেই না কি তার একটার পর একটা বিয়ে করার অধিকার থাকে। সে তার যতই বয়স হোক, যেকটাই বৌ থাক। ওরই নাম না কি কৌলীন্য।
বাচস্পতি তখন তাঁর পরম স্নেহভাজন ছাত্রটিকে বললেন, একটি সুপাত্রীর সন্ধান পাওয়া গেছে, তোমার মত হলেই বিয়েটা হতে পারে।
ঈশ্বর কিন্তু খুব খেপে গেল শুনে। গুরুকেও সে ছেড়ে কথা কইল না। বলল, আপনার তো আর বেশি দিন বাঁচবার সম্ভাবনা নেই, একটি মেয়েকে পথে বসাবেন কেন? বিয়ে দূরের কথা, বিয়ের চিন্তাতেও আপনার পাপ হবে।
এ কথা শুনে কি খুশি হয় কেউ? গুরুজী পালালেন তার সামনে থেকে। পালালেন এবং অবিলম্বেই বিয়েটা সেরে ফেললেন। ঐ বুড়োর এই বৌ! ‘এ ভিটেয় আর জলস্পর্শ করব না।’ বলে সটান চলে এল ঈশ্বর সে-বাড়ি থেকে। বলা বাহুল্য, কদিনের মধ্যেই সেই মেয়েকে বিধবা করে বাচস্পতি মশাই পালালেন ধরাধাম ছেড়ে।
এই ঘটনা চিরস্থায়ী হয়েছিল বিদ্যাসাগরের মনে। এই লোকগুলোর খেয়ালের ফল যে কী ভয়াবহ হতে পারে, ছোটোবেলা থেকে তার চেহারা দেখে বড়ো হয়ে উঠল ঈশ্বর, হয়ে উঠল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। আর, এই পুরনো পৃথিবীর রীতিনীতি ঝেড়েঝুড়ে ফেলে মানুষকে নতুন করে সুস্থ ভাবে বাঁচানোর পথ খুঁজে বেড়াতে লাগল সেদিনের সেই ছোট্ট ক্ষীণাঙ্গ বালক ঈশ্বর।
১৮৪১ খ্রিষ্টাব্দে কলেজ ছেড়ে বেরুল সে। সর্বশাস্ত্রে পরংগম বলে পণ্ডিতমশাইরা তার নাম দিলেন ‘বিদ্যাসাগর’।
(শঙ্খ ঘোষের বিদ্যাসাগর গ্রন্থ থেকে পুনর্মুদ্রিত)